আমার বাবা আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম - GBnews24
Bangla News
Add Post
Menu
Games
8 1 8 Best strategy game


আমার বাবা আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম ||

আজকে এ লেখাটা লিখতে হচ্ছে একবুক কষ্ট নিয়ে। আজ বাবা আমাদের মাঝে নেই, তিনি ১১ নভেম্বর ২০১৬, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টায় ইন্তেকাল করেছেন। তিনি আর কখনও আমাদের মাঝে আসবেন না, চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

জীবন প্রবহমান এক গতিধারা। কখনো তরঙ্গময়, কখনো নিস্তরঙ্গ। ক্ষণিকের যাত্রা হয়তো। আর কিছু না। বেঁচে থাকাই যেন বিস্ময়, তবে ভালো কাজের মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ করাটাই মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যাতে মৃত্যুর পরও মানুষ বেঁচে থাকার সময়ে যে কাজ করা হয় তা নিয়ে আলোচনায় মেতে থাকে। জীবন যাতে মানবকল্যাণে, দেশের কল্যাণে নিবেদিত থাকে।

আব্বা আমাদের কাউকে কিছু না বলে, কাউকে কিছু করার কোন সুযোগ না দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আর কখনও আব্বার সাথে দেখা হবে না, কথা হবে না এটি আমার কাছে দুঃস্বপ্নের মত মনে হয়। খবরটা শোনার পরও বিশ্বাস করিনি, ভেবেছি কোথাও কোন ভুল হচ্ছে।

 

জীবন বহমান। সকল হারানো কিংবা শোক-তাপের ঊর্ধেও জীবন স্বীয় গতিতে চলবে। এটাই চিরন্তন সত্য। স্মৃতি শুধুই স্মৃতি। কিছু স্মৃতি বড়ই বেদনাদায়ক। কিন্তু স্মৃতিকে যেমন ভূলে থাকা যায় না তেমনি অস্বীকারও করা যায় না।

বাবাকে আমি ‘আব্বা’ ডাকতাম, আমার কাছে মনে হতো এই সম্বোধনটাই বেশি কোমল এবং বেশি কাছের।

প্রতিটি সন্তানের বুক জুড়ে থাকে বাবার প্রতি চির অম্লান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। এই ভালোবাসা জগতের সকল কিছুর তুলনার ঊর্ধে। আর সেই ভালোবাসা যদি সঠিক সময়ে সঠিক প্রয়োগ না হয়, তাহলে জীবনের প্রতিটি পদে, প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে নিজের কাছে-ই অপরাধী করে তুলতে পারে। আমি জানি, আমি আমার বাবাকে কতোটা ভালোবাসি। কিন্তু আজ আমার সেই ভালোবাসা আমি কাকে প্রর্দশন করবো? কাকে আমি সেই প্রিয় ‘আব্বা’ বলে ডাকবো? আমার ভাগ্যবিড়ম্বিত এই আক্ষেপ অন্তরের। এই জ্বালা কি কোনদিন নিভবে?

আমার বাবা ছিলেন ঝালকাঠী জেলার রাজাপুরস্থ সাতুরিয়া হামিদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। আমার বই পড়ার অভ্যেস বাবাকে দেখেই। প্রচুর ইংরেজি শব্দ জানতেন, ছোটোবেলায় আমাদের শেখাতেন। তার শিক্ষকতার আদর্শই তার সমগ্র জীবনাচরণের অঙ্কুর ও শেকড়কে ধারণ করেছিল। এদিকে তার সকল মানবিক গুণাবলি, কর্তব্য-পরায়ণতা, দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা, সাহসিকতা ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর সমুদয় সত্যনিষ্ঠায় যর্থাথই হয়ে উঠেছিল তার পরিচয় I

আমার বাবা আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম এলাকায় গড়ে তুলেছেন বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে সাতুরিয়া ইঞ্জিনিয়ার এ,কে,এম রেজাউল করিম কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজ, আমড়াঝুড়ি জামিয়া ইসলামীয়া বহুমুখী দাখিল মাদ্রাসা, কে,এম, আ: করিম জামিয়া ইসলামীয়া এতিমখানা অন্যতম।

এছাড়াও শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মাওলানা আ: রহীম, (র:) স্মৃতি পাঠাগার, মোস্তফা হায়দার একাডেমী, পূর্ব আমড়াঝুড়ি বায়তুল মামুর জামে মসজিদ, সাতুরিয়া খানবাড়ী জামে মসজিদ, উত্তর তারাবুনিয়া মোল্লাবাড়ী জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠির মানোন্নয়নে ভূমীকা রেখেছেন। সম্প্রতি কাউখালি শহরে দৃষ্টি নন্দন ফোয়ারা ও বিশ্রামাগার স্থাপিত হয়েছে মোসলেম আলী খান ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায়। ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলায় তিনি বাংলা অনুবাদ কোরআন শরীফ বিতরন করেন।

সেবামূলক কাজ পরিচালনার জন্য মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে গরীব ছাত্র-ছাত্রী ও মসজিদের ইমামদের মধ্যে আর্থিক সহয়তা প্রদান করেছেন। রাজাপুর শহরে আর্সেনিক মুক্ত বিশুদ্ধ পানির জন্য তিনি সম্প্রতি ইসরাব নামক একটি এনজিওকে ঋন দিয়েছেন।

বাবা কতো লোকের উপকার করেছেন, কতো স্টুডেন্টকে ফ্রিতে পড়িয়েছেন, পার্থিব সম্পদের চাইতে মনের ঐশ্বর্য বাড়াতে চেষ্টা করেছেন; কিন্তু কখনোই বিন্দুমাত্রও অহংকার দেখাতে দেখিনি। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায় আমার বাবা একজন আজন্ম সংগ্রামী মানুষ ছিলেন। সভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি ধর্মভীরু ছিলেন, কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না। কখনোই তার মধ্যে কোন গোঁড়ামি দেখিনি।

ভয়াবহ ঘুর্নঝড় সিডরের পরে মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের ত্রান তৎপরতা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। এ সময় তার প্রতিষ্ঠিত মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কাউখালি, ভান্ডারিয়া, ঝালকাঠি সদর, রাজাপুর, কাঠালিয়া, পিরোজপুর, পটুয়াখালির কলাপড়া, বরগুনার পাথরঘাটা এবং বাকেরগঞ্জ থানায় ৩ হাজার ৬শ ৭০ জন দূর্গত মানুষের মধ্যে শাড়ি-লুঙ্গি, শীতের কাপড়, শুকনো খাবার, হাড়ি-পাতিল,থালাবাসন, খাবার স্যালাইন, ঔষধ ও নগদ অর্থ বিতরন করেন। কুরবানীতে তিনি কাউখালি ও ভান্ডারিয়ার প্রতিটি ইউনিয়নে এবং রাজাপুর ও ঝালকাঠিতে পশু কোরবানী দিয়ে সিডর আক্রান্ত ২ হাজার দুস্থ মানুষের মধ্যে গোশত বিতরন করেছেন। সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক সাহায্য করেছেন। যার মধ্যে কাউখালির কেউন্দা স্কুল ও সাতুরিয়া রহমIতয়া দাখিল মাদ্রাসা অন্যতম। এসব এলাকায় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কিছু মসজিদেও তিনি আর্থিক সহয়তা প্রদান করেন।

আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া আমার বাবা। আমার বাবা সারাজীবন মানুষের উপকার করেছেন। তিনি নিজেকে নিয়ে যতটুকু ভাবতেন তার চেয়ে বেশি ভাবতেন দেশ এবং সমাজকে নিয়ে। তার জীবনের আদর্শ ছিলো মানুষের উপকার করা। সাধারণভাবে চলাফেরা করা তার পছন্দ ছিলো। তিনি সারাজীবন সৎভাবে জীবনযাপন করেছেন, মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছেন, কারো কোনো ক্ষতি করেননি। “কারো উপকার করতে না পারো, কখনোই কারো ক্ষতি কোরো না।” ছোটোবেলা থেকেই এটা সবসময়ই বাবার মুখে শুনে এসেছি।

ছোট বেলায় বাবা যেমন আদর করতেন, তেমনি শাসনও করতেন। অন্যায়কে পশ্রয় দিতেন না তিনি কখনও। সব সময় শিখিয়েছেন- চরিত্রবান হতে হবে, সৎপথে চলতে হবে। লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হতে হবে। তাঁর স্বপ্ন ছিল আমরা যেন পড়ালেখা শেষ করে ‘মানুষের মত মানুষ’ হতে পারি। পড়ালেখা করেছি, ‘মানুষ’ হতে পারব কিনা জানিনা। শুধু বলতে পারি তার প্রত্যাশা পূরণে আমি আজও নিরন্তর সাধনায়।

বাবা আমাদের জন্য তার আদর্শ রেখে গেছেন। না, আদর্শ মানে গালভরা কিছু নয়। সামান্য নিয়েও সততার শক্তিতে আর ভালোবাসায় কিভাবে সবকিছু কানায় কানায় ভরিয়ে রাখা যায়, এ শিক্ষা তো দিয়ে গেছেন। ছোট্ট একটা জীবন আনন্দময় করার জন্য সততার চেয়ে বড় আদর্শ আর কী হতে পারে।

প্রতিটি সন্তানের কাছে এক শ্বাশত, মহান ও গভীর অনুভূতিপূর্ণ শব্দ হলো বাবা। সন্তান, কিংবা পরিবার, সবার কাছেই বাবা আশ্রয়ের নাম, নির্ভরতার প্রতীক। বাবার অবদান, ত্যাগ, স্নেহ, ভালোবাসা সকল তুলনার ঊর্ধে। পিতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক কখনো শ্রদ্ধার, কখনো ভয়ের আবার কখনো বা বন্ধুত্বের। পৃথিবীর সব সন্তানের কাছেই তার মা-বাবাই শ্রেষ্ঠ। আমার কাছেও তাই। পৃথিবীতে অন্য আট-দশ জন বাবা থেকে আমার বাবা একটু আলাদা। কারণ বাবার চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা সবকিছু ভিন্ন রকম। পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষকে দেখেছি নিজের স্বার্থের জন্য মানুষের উপকার করে। কিন্তু সবসময় আমার বাবাকে দেখতাম নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করতে। প্রয়োজনে নিজের ক্ষতি করে হলেও মানুষকে সাহায্য ও সহযোগিতা করত। তার সঞ্চয় ছিল শুধু মানুষের ভালোবাসা। আজন্ম লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বেব থেকে গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। সেবার দ্বারা ও মহৎ কর্মের মাধ্যমে আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে মানুষটি অবদান রেখেছিলেন, সে মানুষটি আজ তার নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত। মানুষকে ভালোবাসলে, তাদের জন্য কাজ করলে ও জীবন উৎসর্গ করলে মানুষ ভালবাসায় তার প্রতিদান দেয়। হয়ত আব্বার অনেক ভুলত্রুটি ছিল, ভুলত্রুটি ছাড়া তো কোন মানুষ নেই। আব্বার জানাজায় অনেক মানুষ এসেছিলেন । সবাই আব্বার জন্য আল্লার কাছে দোয়া করেছেন, একজন ভাল মানুষ হিসেবে তাঁর হয়ে মাফ চেয়েছেন।

বাবা আজ তুমি নেই , আজ তুমি ছাড়া আমরা যে কি অসহায় তা বুঝতে ভুল হয়না একটি বার। তুমি ছিলে আমাদের প্রান আর আমরা ও ছিলাম তোমার প্রান। আল্লাহ আমার বাবার সকল পাপ মাফ করো, কবরের আযাব মাফ করো, তার রূহের শান্তি দাও, তাকে জান্নাত দাও ।

রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছগীরা ।

রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছগীরা ।

‘‘হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাদের প্রতিপালন করেছিলেন।’’

(সূরা বনি ইসরাঈল- ২৪) ।

লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ ।

Related News

See more
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
ক্রিকেট প্রেমীক ঝিনাইদহের বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর বক্স 
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
কিশোরীগঞ্জে-বয়স্ক ভাতার পরিবর্তে ইউপি সদস্যের থাপ্পর খেলেন ৭৭ বছরের বৃদ্ধ
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
কানাডায় শেষ হলো টিউলিপ উৎসব
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
কমিউনিটি লিডার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মিয়া মনিরুল আলম এর রোগ মুক্তি কামনা
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
কপি চাষে স্বাবলম্বী কৃষক
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
ইমিগ্রেশন
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
আল্লাহ এ কোন গজব দিলায়’’ ’’ছেলে-মেয়েদের কিতা খাওয়াইতাম’’ নবীগঞ্জে দিশেহারা কৃষকের কান্না
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
আমি আছি শীতার্তদের পাশে তুমি ও শীতার্তদের পাশে এসে দাড়াও" এই হাহাকার একটু উষ্ণতার জন্য
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
আমি সবসময় অসহায় মানুষের পাশে থাকতে চাই ... বিদিশা
26.Mon - Jun 03:06:34 pm
আমার বাবা আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম
© Copyright 2017 By GBnews24.com LTD Company Number: 09415178 | Design & Developed By (GBnews24 Group ) ☛ Email: gbnews24@gmail.com

United States   USA United States