বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে অচলাবস্থা, মুলে নিয়োগ নৈরাজ্য ও আইন অমান্যতা

responsive

দে লো য়া র  জা হি দ  ||

বাংলাদেশের সিংহ ভাগ  বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে  প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) ও প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর ও ট্রেজারার সহ গুরুত্বপূর্ণ  পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া ছাড়া ও এগুলোতে  সিদ্ধান্তহীনতা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। "বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রদত্ত তথ্য দেখায় যে ১০৪টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টিতে ভিসি পদ খালি রয়েছে, 80টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও প্রো-ভিসি নেই এবং ৪৯ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষের পদ শূন্য রয়েছে।"(সূত্র-ডেইলি সান) সূত্রটি আরো জানায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট-২০১০ -এর ২৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে যে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রারের মতো ব্যক্তিদের স্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে চ্যান্সেলর অনুমোদনের অনেক ক্ষেত্রে উল্লিখিত নিয়মের ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হতে দেখা যায় শুধু তা-ই নয় এ প্রক্রিয়ার মধ্যেও দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ৩১ ধারায় ভাইস-চ্যান্সেলর, ৩২ ধারায় প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর এবং ৩৩ ধারায় ট্রেজারার নিয়োগ সংক্রান্ত বিধি-বিধান উল্লেখ থাকলেও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ৩৭ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা সংবিধি ও ৪৩ ধারা অনুয়ায়ী বেতন কাঠামো ও চাকুরী প্রবিধানমালা প্রণয়নের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ৩৭ ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা সংবিধি ও ৪৩ ধারা অনুয়ায়ী বেতন কাঠামো ও চাকুরী প্রবিধানমালা প্রণয়নের দৃষ্টান্ত রয়েছে। এগুলো সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সুপারিশক্রমে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ এর অনুমোদন এবং ইউজিসির সম্মতিক্রমে তা চুড়ান্তকরণ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল নামমাত্র কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এসকল নিয়ম ও শর্তাবলী পূরণপূর্বক অনুসরণ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলো কর্তৃক নিজস্ব সংবিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো ও চাকুরী প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়নি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন জব সাইট এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রার্থী নিয়োগ প্রদান করলেও কিছু সংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন নিজদের পছন্দের প্রার্থী নিয়োগের লক্ষ্যে অনলাইন ওয়েভ সাইডে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা কোন ধরনের বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই  নতুন ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের প্রচেষ্টা গ্রহণ করে থাকে।  কোন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার অনুমোদন লাভ করার ক্ষেত্রে ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রবণতা সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ভিসি প্যানেল প্রস্তাব প্রেরণের জন্য জোর দিয়ে থাকে যেখানে ট্রেজারার নিয়োগ উপেক্ষিত হয়ে থাকে। এর ফলে পরবর্তী ৪ বছরেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় আর ট্রেজারার নিয়োগের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে না এবং চ্যান্সেলর অনুমোদহীন ট্রেজারার ছাড়াই সে সকল বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে  শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার জন্য ভিসি ও ট্রেজারারের নিয়োগকে একই সাথে প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ২০১০ এর ১৬(৯) উপ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ক্ষমতা ও দায়িত্ব হিসাবে  ধারা ৩১, ৩২ এবং ৩৩ এর বিধান অনুসরণ করে চ্যান্সেলরের সমীপে প্রস্তাব পেশ করার বিধান রয়েছে। শংকার বিষয় হচ্ছে এ ক্ষেত্রে কিছু সংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি/রেজিস্ট্রার অফিসকে জড়িত না করে নিজদের পদন্দের প্রার্থীর প্যানেল তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে থাকে। এমনকি কোন কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগ বোর্ডও গঠন করা হয় না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ বিদ্যমান থাকায় অধিক যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রার্থীরা এ সকল পদে নিয়োগ লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন যা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও গুণগত শিক্ষা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। জানা যায় যে তদবির, স্বজনপ্রীতি ও অনৈতিক আর্থিক সুবিধাগ্রহণার্থে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় যোগ্য প্রার্থীকে নামমাত্র বাছাই করে সর্ট লিষ্টে অন্তভুক্ত করে না। এমনকি প্রস্তাব প্রেরণ ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ও সমন্বিত কোন নীতি বা পদ্ধতি অনুসরণ  করা হয়না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে কম যোগ্যতাসম্পন্ন বা নিজদের পছন্দের প্রার্থী নিয়োগের সুযোগ লাভ করে থাকেন। কিছু সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে নিজদের আঞ্চলিক বা পছন্দনীয় প্রার্থী নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে কম যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীদের প্যানেলভুক্ত করে চ্যান্সেলরের অনুমোদন লাভের উদ্দেশ্যে অধিক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীদের নাম  বাদ দিয়ে তথা ৩ জনের প্যানেলে তাদের নাম না রেখে প্যানেল প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। এ ধরনের প্যানেল প্রস্তাব ইউজিসির প্রক্রিয়া পর্যায়ে কখনও ধরা পড়লে যারা প্রস্তাবিত পদে নিয়োগের কোন যোগ্যতা নেই তাদের নাম বাদ দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে নতুন প্যানেল প্রস্তাব ইউজিসিতে প্রেরণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ জানায়। এর প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় পূর্বের আবেদনকারী প্রার্থীদের মধ্যে থেকে চাহিত সংখ্যক প্রার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত করে নতুন প্যানেল প্রস্তাব ইউজিসিতে প্রেরণ করে থাকে। কোন ক্ষেত্রে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে পুন: বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতেও দেখা যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করায় অধিক যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রার্থীরা এ সকল পদে নিয়োগ লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন।

গত এক যুগের অভিজ্ঞতার আলোকে  সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাদকতা সৃষ্টি করা এবং জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি অনলাইন জব সাইটে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করাকে ও উৎসাহিত করা;  বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে কমযোগ্য নিজদের আঞ্চলিক বা পূর্ব সম্পর্কের প্রার্থী নিয়োগ প্রদান করার ক্ষেত্রে যেন যোগ্য প্রার্থীদের দরখাস্ত বাদ না দিতে পারে সে জন্য আবেদন পত্রের সাথে ১০০.০০ (একশত)/৫০.০০ (পঞ্চাশ) টাকা টোকেন পেঅর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট্/বিকাশ/রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে প্রেরণের বিষয়টি প্রবর্তন করা যেতে পারে। ভিসি/প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার নিয়োগের ৩ জনের প্যানেল প্রস্তাবের সাথে যোগ্য অন্যান্য প্রার্থীদের তথ্য সম্বলিত একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা (১/২পৃষ্টা) প্রেরণের বিষয়টিও প্রবর্তন করা যেতে পারে যেখানে পেঅর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট্/ বিকাশ/ রকেট ইত্যাদিতে টাকা প্রেরণ সম্পর্কিত তথ্যও থাকতে পারে। কোন ক্ষেত্রে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অযোগ্য প্রার্থীর তালিকা প্রেরণ করলে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়কে ইউজিসি হতে পুন: নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার নিদের্শনা দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে স্বীকৃতি নেই এমন ভূয়া ডিগ্রীধারী বা বিধান অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা/প্রশাসন কাজে অভিজ্ঞতা নেই এমন প্রার্থীরা যেন তদবীরের জোরে যাতে এ সকল পদে নিয়োগ লাভ না করতে পারে সে বিষয়টি ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিশ্চিত করতে হবে ।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মান সম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অচলাবস্থাগুলো  দূর করার উদ্যোগ নেয়া, নিয়োগ নৈরাজ্য ও আইন অমান্যতার প্রতিকারে কঠোর ব্যবস্থা করা  প্রয়োজন।

[লেখক : সিনিয়র রিসার্চ ফ্যাকাল্টি মেম্বার, প্রাবন্ধিক ও রেড ডিয়ার (আলবার্টা, কানাডা ) নিবাসী]

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন