মস্কোর একটি আদালত রুশ বিরোধীদলীয় নেতা আলেক্সি নাভালনির বিধবা স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে তাস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া বর্তমানে রাশিয়ার বাইরে বসবাস করেন। তার বিরুদ্ধে ‘চরমপন্থি সমাজে অংশগ্রহণে’ অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত এক দশকে রাশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী বিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত অ্যালেক্সাই নাভালনি গত ১৬ ফেব্রুয়ারি কারাগারে মারা যান।
রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক জানিয়েছে, কারাগারে হাটাহাটির পর নাভালনি অসুস্থ বোধ করেন ও এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যান। এরপর তার জ্ঞান ফেরানোর সকল চেষ্টা করা হলেও তাতে কোনো ফল আসেনি।
তবে রুশ কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক কারণে মৃত্যু হয়েছে বললেও, তার স্ত্রী বলেছেন, নাভালনিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘নির্যাতন চালিয়ে ও ক্ষুধার্ত রেখে হত্যা করেছে।’
এদিকে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইউলিয়া নাভালনায়া এক্স-এ পোস্ট করে বলেছেন, ‘আপনি যখন এ বিষয়ে লিখবেন, দয়া করে মূল জিনিসটি লিখতে ভুলবেন না: ভ্লাদিমির পুতিন একজন খুনি এবং একজন যুদ্ধাপরাধী।
’
তিনি আরো বলেন, ‘তার (পুতিন) জায়গা কারাগারে, হেগের কোথাও নয়। একটি টিভিসহ আরামদায়ক সেলে, তবে রাশিয়ায় সেই একই উপনিবেশে এবং একই দুই বাই তিন মিটারের সেল, যেখানে তিনি (পুতিন) আলেক্সিকে হত্যা করেছিল।’
মস্কোর আদালত রায় দিয়েছেন, তাকে ওয়ান্টেড ঘোষণা করা হয়েছে এবং তাকে হেফাজতে রিমান্ডে নেওয়া উচিত। এর অর্থ, তিনি রাশিয়ায় পা রাখলেই গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হবেন।
অভিযোগগুলো ২০২১ সালের জুনে মস্কো আদালতের রায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যেখানে নাভালনির সঙ্গে যুক্ত তিনটি সংস্থাকে ‘চরমপন্থী’ হিসাবে চিহ্নিত করে বেআইনি ঘোষণা করেছিল।
নাভালনায়া মার্চ মাসে নাভালনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে পারেননি। নাভালনির মৃত্যুর পর তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ বেশ কয়েকজন পশ্চিমা নেতার সঙ্গে দেখা করেছেন। এই মাসে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
এটি একটি অলাভজনক সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষার জন্য কাজ করে। ইউলিয়া নাভালনায়া বলেছেন, পুতিনের বিরুদ্ধে তার স্বামী যে লড়াই করেছিলেন তা তিনি চালিয়ে যাবেন।
২০২৩ সালের আগস্টে অ্যালেক্সাই নাভালনিকে উগ্রপন্থায় উস্কানি, অর্থায়ন ও একটি উগ্রপন্থি সংগঠন প্রতিষ্ঠার অভিযোগে নতুন করে ১৯ বছরের জেল দেওয়া হয়েছিল। নাভালনিকে সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল। গত বছরের শেষের দিকে নাভালনিকে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর কারাগার হিসেবে পরিচিত আর্কটিক পেনাল কলোনিগুলোর একটিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। দেশটির রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সবচেয়ে কট্টর সমালোচক হিসেবে দেখা হতো নাভালনিকে।
সরকারের দুর্নীতি প্রকাশ করে দেওয়র মধ্যে দিয়ে রাজনীতিতে তার নাম উঠে আসে। তিনি পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া দলকে উল্লেখ করেছিলেন অসৎ ও চোরেদের দল হিসেবে। এজন্য বেশ কয়েকবার তাকে জেলে যেতে হয়েছে।
পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া সংসদীয় নির্বাচনে ভোট কারচুপি করেছে বলে প্রতিবাদ করার পর, তাকে ২০১১ সালে ১৫ দিনের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর নাভালনিকে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে তছরূপের অভিযোগে অল্পদিনের জন্য জেলে পাঠানো হয়। তবে নাভালনি বলেন, এই দণ্ডাদেশ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রতারণার দায়ে তিনি আগে দোষি সাব্যস্ত হয়েছিলেন, এই কারণ দেখিয়ে তাকে প্রার্থিতা দেওয়া হয়নি। নাভালনির মতে, এটাও ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।অনুমোদন না থাকার পরও প্রতিবাদ বিক্ষোভ করার জন্য ২০১৯ সালের জুলাইতে নাভালনিকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়।
তখন তিনি কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা তখন বলেছিলেন, ‘কোনো কিছুর স্পর্শ থেকে চামড়ার প্রদাহ হয়েছে।’ কিন্তু নাভালনি জানান, তার কোনদিন কোনো কিছু থেকে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া আগে হয়নি।
এরপর তার নিজের চিকিৎসক জানান, নাভালনি বিষাক্ত কোনো পদার্থের সংস্পর্শে এসেছিলেন। নাভালনিও বলেছিলেন, তার ধারণা তাকে বিষ দেওয়া হয়েছে। নাভালনির ওপর ২০১৭ সালে অ্যান্টিসেপটিক রং দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল, তখন তার ডান চোখ রাসায়নিকে গুরুতরভাবে পুড়ে যায়।
নাভালনি পুতিনের দলকে চুরি-জালিয়াতির আখড়া বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এই প্রেসিডেন্ট ব্যবস্থাকে রাশিয়ার রক্তকে চুষে খাওয়ার সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন। এ ছাড়া তার ভাষ্যমতে সামন্তবাদী রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়েছে এবং তা ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছিলেন নাভালনি। নাভালনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভের নেতৃত্বও দিয়েছেন।
জিবি নিউজ24ডেস্ক//

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন