হুসনা খান হাসি ||
বিশ্বব্যাপী যৌন হয়রানি একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা, যা লক্ষ লক্ষ নারী, পুরুষ এবং শিশুর জীবনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এটি এমন এক আচরণ বা কার্যকলাপ যা অপর ব্যক্তির প্রতি অনিচ্ছাকৃত যৌন মন্তব্য, স্পর্শ বা প্রস্তাবের মাধ্যমে ঘটে এবং যার ফলে ব্যক্তির সম্মান ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
যৌন হয়রানি শুধু শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির কারণ নয়, এটি ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বরও স্তব্ধ করে রাখে। লজ্জা, ভয়, সামাজিক অপমান এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিবাদে বড় বাধা সৃষ্টি করে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে #MeToo এবং অন্যান্য আন্দোলন যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করেছে, তবুও অনেক ভুক্তভোগী এখনও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকে।
এটি শুধুমাত্র অপরিচিতদের দ্বারা সংঘটিত হয় না; অনেক সময় পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরাও এর সাথে জড়িত থাকে। বাবা, সৎ বাবা, চাচা, ভাই বা কাজিনরা এই নির্যাতনের জন্য দায়ী হতে পারে, এবং পরিবারের সামাজিক স্টিগ্মা বা লজ্জার কারণে এই ঘটনা অনেক সময় গোপন থাকে, যা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। এর ফলে অধিকাংশ ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশ্বব্যাপী যৌন হয়রানি একটি প্রচলিত সমস্যা, তবে এর প্রকৃত পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে সাহস পান না এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংজ্ঞা ও রিপোর্টিং ব্যবস্থায় পার্থক্য রয়েছে। তবে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরা যায়:
১- বিশ্বব্যাপী নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ নারী তাদের জীবনে যৌন সহিংসতার শিকার হন, যা সাধারণত তাদের পরিচিত বা কাছের মানুষের দ্বারা ঘটে।
২- শিশু যৌন সহিংসতা: ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন মেয়ে ও নারী এবং ৪১০-৫৩০ মিলিয়ন ছেলে ও পুরুষ শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হন।
৩- কর্মস্থলে যৌন হয়রানি: একটি মার্কিন গবেষণায় দেখা গেছে, ৮১% নারী এবং ৪৩% পুরুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে যৌন হয়রানি বা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
৪- চিকিৎসা পেশায় যৌন হয়রানি: এক গবেষণায় প্রকাশ পায়, বিশ্বব্যাপী চিকিৎসকরা প্রায় অর্ধেকই রোগীদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, বিশেষত ৫২.২% মহিলা ডাক্তার এবং ৩৪.৪% পুরুষ ডাক্তার এ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, যৌন হয়রানি এবং সহিংসতা একটি বড় এবং গুরত্বপূর্ণ সমস্যা। এর সমাধানের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি, শক্তিশালী আইন প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীদের সাহায্য প্রদান জরুরি।
যৌন হয়রানির প্রকৃতি এবং বিস্তার
যৌন হয়রানি বিভিন্ন রূপে ঘটতে পারে, যেমন শারীরিক নিপীড়ন, অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন মন্তব্য, অনলাইন হয়রানি, কর্মস্থলে অনৈতিক প্রস্তাব এবং পাবলিক স্পেসে মানসিক নির্যাতন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, ৬০% নারী কর্মজীবনে যৌন হয়রানির শিকার হলেও মাত্র ২৫% তার প্রতিবাদ করেন।
সামাজিক স্টিগ্মার প্রভাব
যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সামাজিক লজ্জা ও হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়। সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি রয়েছে, যেখানে ভিকটিমদের দোষারোপ করা হয়, যার কারণে অনেক ভিকটিম তাদের অভিজ্ঞতা গোপন রাখেন। ভুক্তভোগী যদি প্রতিবাদ করেন, তবে সামাজিকভাবে তাদের সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে তারা চুপ থাকেন। এই কারণে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
স্টিগ্মার কিছু সাধারণ দিক:
১- ভুক্তভোগীর দোষারোপ করা:
“সে নিশ্চয়ই কিছু করেছে যার কারণে এমন হয়েছে।”
“তোমার পোশাক ঠিক ছিল না বলেই এমন হয়েছে।”
২- পরিবারের সম্মান রক্ষার অজুহাতে অভিযোগ না করা:
“এটা জানাজানি হলে পরিবারের সম্মান ক্ষুন্ন হবে।”
“এ নিয়ে কথা বললে তোমার বিয়ে হবে না।”
৩- ভুক্তভোগীর মানসিক অবস্থা: অনেকেই হতাশায় ভোগেন এবং কখনো কখনো আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
যৌন হয়রানি এবং এর প্রভাব
১- মানসিক ও শারীরিক প্রভাব: ভুক্তভোগীদের মধ্যে ভয়, দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা, PTSD, এবং আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়।
২- অর্থনৈতিক ক্ষতি: অনেক নারীরই যৌন হয়রানি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কর্মস্থল ছেড়ে দিতে হয়। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়।
৩- নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিবন্ধকতা: যৌন হয়রানি নারীদের সামাজিক ও পেশাগত উন্নয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে, যা লিঙ্গ সমতার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই
১- কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আইনি সহায়তা: বাংলাদেশে আইন থাকলেও এর বাস্তবায়ন দুর্বল। দ্রুত বিচার এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
২- সাহসী কণ্ঠস্বর তৈরি করা: #MeToo এবং অন্যান্য সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে অনেকেই তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন, এভাবে বাংলাদেশেও আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত।
৩- শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা উচিত।
৪- নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা: কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, এবং অভিযোগ জানাতে সহজ ও গোপনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।
উপসংহার
যৌন হয়রানি একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা, যা শুধু আইন দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এটি প্রতিরোধ করতে হলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীদের সমর্থন জোরদার করা প্রয়োজন। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে নীরবতা ভেঙে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা ভয়হীনভাবে নিজেদের কণ্ঠ তুলে ধরতে পারেন এবং সমাজ তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন