বাংলাদেশ জৈব চাষের মাধ্যমে GDP বৃদ্ধির সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে

gbn

নিজাম এম রহমান FRSA ||

ঢাকা, বাংলাদেশ – খাদ্য উৎপাদনে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে, রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টসের ফেলো ও টেকসই উন্নয়নের প্রবক্তা নিজাম এম রহমান FRSA বাংলাদেশে জৈব চাষের মধ্য দিয়ে একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।

এক সাম্প্রতিক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বিশ্বজুড়ে জৈব খাদ্যের বাজার ২০২৩ সালে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে এটি ৪০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে (Statista)। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের এখনই উপযুক্ত সময়।”

জৈব চাষের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বিশ্বজুড়ে গ্রাহকরা এখন আরও স্বাস্থ্যসচেতন। ক্যান্সার, হরমোনজনিত সমস্যা, এবং অন্যান্য রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে রাসায়নিকমুক্ত খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। রহমান বলেন, “এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে থেকে বাংলাদেশ শুধু একটি ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করতে পারে না, বরং উচ্চমূল্যে রপ্তানির মাধ্যমে বিশাল বৈদেশিক আয় অর্জন করতে পারে।”

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি খাত GDP-র প্রায় ১২.৭% (২০২৩) অবদান রাখে। “এই খাতকে যদি জৈব এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের দিকে ধাবিত করা যায়, তবে আগামী পাঁচ বছরে কৃষি খাত থেকে GDP-তে অতিরিক্ত ২-৩% প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব,” রহমান ব্যাখ্যা করেন।

বিশেষ করে চাল, ফলমূল, শাকসবজি, মধু, এবং ভেষজের ক্ষেত্রে জৈব উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের সিকিম রাজ্য ২০১৬ সালে সম্পূর্ণ জৈব রাজ্যে রূপান্তরিত হয় এবং এর ফলে রাজ্যে কৃষিপণ্যের গড় মূল্য ২০-৩০% পর্যন্ত বেড়ে যায় (FAO, UN)। বাংলাদেশও অনুরূপ রূপান্তরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে।

ফরমালিন-মুক্ত মাছ: সম্ভাবনার আরেক দ্বার

মৎস্য খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। ফিশারিজ সেক্টর দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ২.৫%-এর বেশি অবদান রাখে (DoF, 2023)। কিন্তু ফরমালিনের মতো বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুন্ন করছে।

“মাছ সংরক্ষণে ফরমালিন ব্যবহার বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য বর্জনের অন্যতম কারণ হতে পারে,” রহমান হুঁশিয়ারি দেন। “তবে সরকার যদি মাছ সংরক্ষণের বিকল্প পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নিয়মনীতি চালু করে, তবে বাংলাদেশ তার মাছ রপ্তানিকে দ্বিগুণ করতে পারবে।”

সরকারের প্রতি আহ্বান: জৈব কৃষিতে একটি জাতীয় বিপ্লবের সূচনা

রহমান সরকারের কাছে স্পষ্ট আহ্বান জানিয়েছেন—জৈব কৃষির জন্য একটি জাতীয় নীতিমালা এবং প্রণোদনার প্যাকেজ চালু করা হোক। এতে কৃষকরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার থেকে সরে আসতে আগ্রহী হবেন।

তিনি বলেন, “জার্মানি, ফ্রান্স, এবং সুইডেনের মতো দেশ কৃষকদের জৈব চাষে উৎসাহিত করতে শত শত কোটি ইউরো ভর্তুকি দিচ্ছে। বাংলাদেশও যদি এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে, তবে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি এক লাখ ডলারের জৈব কৃষি পণ্যের উৎপাদনে প্রায় ৫ জন সরাসরি এবং আরও ১৫ জন পরোক্ষ কর্মসংস্থান পায়। এর মানে, যদি বাংলাদেশ জৈব কৃষিতে ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে, তবে তা কমপক্ষে ২০,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।

একটি সবুজ এবং লাভজনক ভবিষ্যতের জন্য দিশা

বিশ্ববাজারে পরিবর্তনের হাওয়া স্পষ্ট। গ্রাহকরা এখন কেবল খাদ্য নয়—স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, এবং পরিবেশকে মূল্যায়ন করে। এই নতুন বাস্তবতায়, নিজাম এম রহমান মনে করেন বাংলাদেশ জৈব কৃষিতে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে।

“আমরা যদি আজ সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারি, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ ‘জৈব খাদ্যের গ্লোবাল হাব’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে,” তিনি বলেন।

নিজাম এম রহমান FRSA সম্পর্কে

নিজাম এম রহমান রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টস (FRSA)-এর একজন ফেলো এবং টেকসই কৃষি ও উদ্ভাবনী খাদ্যনীতি নিয়ে কাজ করছেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। তিনি কৃষি, প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতে বহু সামাজিক উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর হিসেবে স্বীকৃত।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন