অস্থির বিশ্বে ঈদ: সংহতি ও মানবতার বার্তা

gbn

হুসনা খান হাসি ||

বিশ্ব আজ এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সামাজিক বিভাজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। প্রতিদিন খবরের শিরোনামে উঠে আসছে ধ্বংসযজ্ঞ, সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র। এমন সংকটপূর্ণ সময়ে ঈদ আসে আনন্দ, সংহতি ও মানবিকতার বার্তা নিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অশান্ত পৃথিবীতে আমরা কীভাবে ঈদ উদযাপন করবো? কেবল ব্যক্তিগত আনন্দেই কি সীমাবদ্ধ থাকবো, নাকি ঈদের প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণ করে দুঃখী, শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াবো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি।

ঈদ শুধুমাত্র একদিনের উৎসব নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংহতি ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয়। ইসলাম ধর্মে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার মাধ্যমে আত্মত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ববোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঈদুল ফিতর রমজানের এক মাস সংযম সাধনার পর আসে, যা আমাদের শেখায় আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং দরিদ্রদের কষ্ট অনুধাবন করা। অন্যদিকে, ঈদুল আজহা কুরবানি বা ত্যাগের মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিজের চাহিদার চেয়ে অন্যের কল্যাণকেই বড় করে দেখা উচিত।

বর্তমান বিশ্বে যখন লাখো মানুষ যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের কবলে রয়েছে, তখন ঈদের শিক্ষা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা জরুরি। ঈদের প্রকৃত আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষ এতে অংশ নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বহু দেশে আজ ঈদ কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনছে না; বরং দুঃখ, বেদনা ও কষ্টকে আরও প্রকট করে তুলছে।

আজকের বিশ্বে যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, সুদান এবং ইউক্রেনের মতো দেশগুলোতে যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষ ভয়াবহ দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ঈদের দিনেও তারা খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সংগ্রাম করছে।

ধরুন, প্যালেস্টাইনের গাজা উপত্যকায় বসবাসকারী একটি শিশু, যার পরিবার বোমা হামলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তার কাছে ঈদ কোনো আনন্দের উপলক্ষ হতে পারে না। কিংবা সিরিয়ার এক শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা কিশোরী, যে কখনোই শান্তিপূর্ণ ঈদের স্বাদ পায়নি, এদের কথা ভেবে আমাদের ঈদ উদযাপন করা উচিত। আমরা যদি শুধু নিজেদের খুশির কথা ভাবি এবং বিপদগ্রস্তদের উপেক্ষা করি, তবে আমাদের ঈদ উদযাপন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বহু পরিবার আজ দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশেই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে, কিন্তু আয়ের সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কারণ তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

ঈদ মানেই নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার ও আনন্দময় সময় কাটানো, কিন্তু যখন সমাজের একটি বিশাল অংশ এসব থেকে বঞ্চিত থাকে, তখন আমাদের দায়িত্ব হয় তাদের পাশে দাঁড়ানো। বিত্তবানদের উচিত দরিদ্রদের সহায়তা করা, তাদের জন্য নতুন পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করা। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, ঈদের আগে ফিতরা প্রদান করা বাধ্যতামূলক, যাতে গরিবরাও ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। আমাদের উচিত এই শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা।

আধুনিক সময়ে ঈদ অনেক ক্ষেত্রেই ভোগ-বিলাসিতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। অনেকেই ঈদকে শুধু নতুন পোশাক কেনা, দামি খাবার খাওয়া ও বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। অথচ ঈদের মূল উদ্দেশ্য হলো সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা। ঈদের দিনে কেউ যদি হাজার হাজার টাকা খরচ করে আনন্দ উপভোগ করে, অথচ পাশের দরিদ্র প্রতিবেশী একমুঠো খাবারও না পায়, তবে এমন ঈদ ইসলাম ও মানবতার দর্শনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

ঈদ হওয়া উচিত মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ। যেমন, তুরস্কের কিছু মুসলিম সম্প্রদায় প্রতি ঈদে আশ্রয়হীন মানুষদের জন্য কমিউনিটি ইফতার ও খাবার বিতরণ করে। একইভাবে, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় স্বেচ্ছাসেবীরা ঈদের দিনে এতিম ও দরিদ্র শিশুদের নতুন পোশাক ও উপহার প্রদান করে। আমাদেরও উচিত এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা, যাতে ঈদের আনন্দ সবাই ভাগ করে নিতে পারে।

সংকটের মধ্যেও ঈদ আমাদের আশার আলো। ঈদ আমাদের শেখায় আশা হারানো যাবে না, যতই সংকট থাকুক, এই উৎসব আমাদের ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। সংকট যত গভীরই হোক, মানবতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে আমরা একে জয় করতে পারি।

বিশ্বব্যাপী শান্তি ও সংহতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ঈদকে ব্যবহার করা যেতে পারে। আমরা যদি ঈদের দিনে নির্যাতিত ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জন্য দোয়া করি, তাদের সাহায্য করি এবং তাদের কষ্ট লাঘবের জন্য কাজ করি, তবে ঈদের শিক্ষা সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হবে।

পরিশেষে, বর্তমান অস্থির বিশ্বে ঈদ উদযাপন করা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশ। ঈদ আমাদের শেখায়, সংকট যত কঠিনই হোক, মানবতা, সংহতি ও সহমর্মিতার মাধ্যমে আমরা একে জয় করতে পারি। ঈদ তখনই প্রকৃত আনন্দ বয়ে আনবে, যখন আমরা শুধু নিজেদের নয়, বরং চারপাশের অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষদের কথাও ভাববো।

তাই আসুন, এবারের ঈদে আমরা শুধু নিজেকে নিয়ে না ভেবে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের পাশে দাঁড়াই। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। ঈদ হোক শান্তির, ঈদ হোক ভালোবাসার, ঈদ হোক মানবতার! ঈদ মোবারক!

 

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন