যে জাতি শাসনে থাকলে শুদ্ধ থাকে, তাদের স্বাধীনতা দিলে বেপরোয়া হবে
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
নৈতিকতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া, বোধ মরে যাওয়া এবং বিবেক পচে যাওয়া জাতির কাছে স্বচ্ছতা দেখানোর প্রচেষ্টা হিতে বিপরীত ঘটাবে। লোকে এটাকে অপচেষ্টা সাব্যস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠবে। তখন আপনি যা পারবেন, তার চেয়ে বরং বেশি চাইবে। এই জাতি সীমালঙ্ঘন করতে ভালোবাসে, অন্যকে আঘাত করতে পছন্দ করে। সবচেয়ে ভালোবাসে—অন্যেরটা দখল করতে। এরা কথা দেয়, কিন্তু কথা রাখে না। অতীতকে ভুলে যাওয়া—এদের প্রথম প্রধান কাজ।
কাজেই, এদের সামনে নৈতিকতা দেখানোর চেয়ে মনে মনে নৈতিকতা ধারণ করা বেশি বুদ্ধিপ্রসূত কাজ হবে। বদলাবার ঘোষণা দিয়ে এদেরকে বদলানো যাবে না। পরিবর্তনের জন্য আলাদা মিশনের পরিকল্পনা করতে হবে। কাউকে পরামর্শ দেওয়া, শোধরানোর চেষ্টা করা কিংবা লাইনে রাখার জন্য—বাজারে নয়, বরং ঘরে বসে বলুন। এ জাতি কিছু নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেলে ঢোল নিয়ে নামবে! প্রজন্মের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ উন্মাদ—যারা তাদের পক্ষের লোকজনকে সিজদা করতে ছাড়ে না। অথচ বিপক্ষ দল যদি সত্যও বলে, তবু তাদের দাপিয়ে তাড়িয়ে বেড়াবে, আঘাত করবে এবং প্রয়োজনে হত্যা করবে।
এখানে সত্য বাঁচে না, শুভ থাকে না। যে জাতি শাসনে থাকলে শুদ্ধ থাকে, তাদের স্বাধীনতা দিলে বেপরোয়া হবে। যারা লাঠি ভয় পায়, আঘাত মেনে নেয়—তাদের ভালোবাসা দিলে দুর্বলতা ভাবে এবং ভালোবাসা দানকরীকেই নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। যারা মানুষের সম্মান দিতে জানে না, যাদের মানুষ হওয়ার শিক্ষা অসম্পূর্ণ —তাদের সামনে নত হলে ভোগ আছে! যারা ছায়াকে সত্য ভাবে এবং বাস্তবতাকে পদাঘাত করে তাদের সামনে সরাসরি সত্য প্রকাশেও কৌশলী হতে হবে। অসত্য যাদের অস্ত্র, সত্য তাদের সামনে বিভীষিকার মতো। কাজেই, উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর আগে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে।
কোনো জাতির নৈতিকতাবোধ একদিনে মরে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বভাব হুট করে হারায় না। পচনের গভীরতা জেনে কথা বলতে হবে। কেবল ওপরে প্রলেপ দিয়ে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে ভাবলে, ভেতরের গন্ধ বাতাসে আরও বহুদূরে টেনে নিয়ে যাবে! সুযোগ পেলে অন্যায়ে জড়াবে না, দুর্নীতি করবে না এবং স্বার্থের জন্য মিথ্যা বলবে না—সংখ্যাটিকে সামান্য ভাবছেন? সুযোগের অভাবে সাধু সেজে থাকাদের সমাজে শাস্তি এবং সাধু বাক্য পাশাপাশি রাখলে স্বস্তি নিশ্চিত হবে। নয়তো বিপদ বাড়বে। এখানে কাউকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া মানে—সকলের স্বাধীনতা নষ্ট করতে ছড়ি ঘুরাবে।
ব্যক্তি, দল এবং গোষ্ঠীর স্বচ্ছতা এবং কাজের জবাবদিহিতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধকে নির্ধারণ করতে হবে মানবিক সংবিধান হিসেবে। তবে কোনো চলমান পরিস্থিতিকে একবারেই আমূল পরিবর্তনের প্রয়াস হিতে বিপরীত ঘটাবে। চিকিৎসকের দক্ষতা হচ্ছে সহনীয় মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ করা। সমাজ সংস্কার কিংবা রাষ্ট্রীয় শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। শতভাগ দুর্নীতিগ্রস্ত মানসিকতার বিপরীতে শতভাগ সাধুতা দেখানো যাবে না। দুর্নীতির মাত্রা কমাতে হবে এবং সাধুত্বের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
আপেক্ষিকতা বজায় রেখে চেষ্টা চলমান রাখলে ভালো মানুষের প্রয়াস একদিন বাস্তবায়িত হবে। নষ্টদের নাগাল থেকে সবকিছুই মুক্ত করতে হবে—তবে ধীরে। তবে ধীরে হাঁটো হে নাবিক, আলোর ফেরিওয়ালা! একদিনে মুক্তি অসম্ভব তবে মুক্ত হবে।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন