প্রার্থীর চাচা-ফুফুর রাজনৈতিক পরিচয়, ভগ্নিপতি-খালুর রাজনৈতিক দল—এসব দেখেও বহু সম্ভাবনাময় ব্যক্তি চাকরি থেকে বঞ্চিত
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
বাংলাদেশ যদি তার খিদমতে মেধাবীদের প্রত্যাশা করে, তবে চাকরিতে ভেরিফিকেশন প্রথা তুলে দিতে হবে। চাকরি প্রত্যাশীদের মনে ও চাকরিজীবীদের কাছে যতগুলো আতঙ্ক ও আশঙ্কার বিষয় আছে, তার মধ্যে চাকরির পূর্বাপর ভেরিফিকেশন সিস্টেম অন্যতম। এটি চাকরিজীবীদের জন্য একটি কালাকানুন।
প্রার্থীর চাচা-ফুফুর রাজনৈতিক পরিচয়, ভগ্নিপতি-খালুর রাজনৈতিক দল—এসব দেখেও বহু সম্ভাবনাময় ব্যক্তি চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কোনো মামলায় বাবা-ভাই আসামি হলে ভেরিফিকেশন রিপোর্ট সন্তোষজনক না হওয়ায় অদম্য মেধাবীও কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি—এমন দৃষ্টান্ত বিগত কয়েক দশকে অহরহ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক মনোভাবাপন্ন ছাড়া আর কাউকে চাকরি দেওয়া যাবে না, পদোন্নতি-পদায়ন হবে না—এই অলিখিত এবং অঘোষিত রেওয়াজ বাংলাদেশে শক্তপোক্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। ‘তোমরা কেবল লিখিত পরীক্ষায় পাশ করে ভাইভা বোর্ড পর্যন্ত আসো—বাকিটা আমরা দেখবো’—মিডিয়ায় প্রচারিত এই ঘোষণা নিশ্চয়ই ভুলে যাওয়া হয়নি।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন মুকুলিত হয়েছে, সেখানে ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক মতাদর্শ দেখে কাউকে চাকরিতে অনুপযুক্ত ঘোষণা করা, যোগ্য কারো পদোন্নতি-পদায়ন আটকে রাখা কিংবা সুপারিশে চাকরি পাওয়া—এই রীতির চিরতরে অবসান চাই। ভেরিফিকেশন প্রথা চিরতরে উচ্ছেদের সময় এখনো আসেনি, কারণ আমরা এখনো পুরোপুরি ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করতে পারিনি। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা আছে কি না এবং সে সনদ জালিয়াতি করেছে কি না—শুধু এটুকুই তদন্তের বিষয় হোক।
বাংলাদেশের বৈধ রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটির অংশ হওয়া সকলের সাংবিধানিক অধিকার। কেউ যদি কোনো দলের সমর্থন না করে নিরপেক্ষ থাকতে চায়, সেটাও তার মানবাধিকার। চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই কিংবা আপন বাবা-ভাই কোন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক, তা বিবেচনায় নিয়ে কাউকে ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে বাদ দেওয়ার রেওয়াজ অমানবিক। গোটা ছাত্রজীবনের স্বপ্ন, সফলতার সঙ্গে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পরীক্ষার প্রতিযোগিতার প্রতিটি স্তর পার করে কেবল ভেরিফিকেশন রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা সম্পূর্ণ অমানবিক।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থানীয় সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত তদন্ত অনেক ক্ষেত্রেই কিছু প্রভাবকের দ্বারা প্রভাবিত হয়। গ্রাম্য নোংরা রাজনীতির কবলে পড়ে অনেকের বিরুদ্ধে অসত্য রিপোর্ট তৈরি হয়। গ্রাম্য পরিবেশে আত্মীয়-স্বজন ও শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশীদের দ্বারা কখনোই সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। ক্যাম্পাসের বন্ধুরাও সবসময় উদারতার পরিচয় দেয় না। কাজেই বর্তমানে চাকরির জন্য ভেরিফিকেশন প্রথা বন্ধ করা উচিত, শুধু ঠিকানা শনাক্তকরণ, সনদ যাচাই-বাছাই এবং ফৌজদারি অপরাধ শনাক্তকরণ ব্যতীত। পাসপোর্টের ক্ষেত্রে যেমন ভেরিফিকেশন বন্ধ করা হয়েছে, চাকরিতেও তেমনটাই হওয়া উচিত।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নির্দিষ্ট এবং সুস্পষ্ট চাকরি বিধি রয়েছে। চাকরিতে প্রবেশের পর কর্মচারীদের কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে ফায়দা নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। যথাযথভাবে চাকরিবিধি মানলে সরকারি চাকরিজীবীরা রাষ্ট্র ও জনতার সেবক হিসেবে পরিণত হবেন। বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না ঘটালে জাতি হিসেবে আমাদের ভাগ্যবদল ও মানবিকতার সূচকে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
চাকরির ক্ষেত্রে প্রচলিত ভেরিফিকেশন প্রথা বন্ধ করে মেধাবী ও যোগ্যদের হয়রানি ও বঞ্চনা থেকে রক্ষা করতে হবে। কোন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন যদি দেশের স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী হয়, তবে সেটাকে নিষিদ্ধ করা হোক। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে বৈধ দল ও তার অনুসারীদের অবৈধ ঘোষণা করা হবে—এমন দ্বিচারিতা দেখানো যাবে না। সরকার সবসময় তার বিপক্ষের শিবিরকে শত্রু সাব্যস্ত করে ন্যায্য অধিকার দিতে অনীহা দেখায়। বাংলাদেশে এখনো সেই উদার গণতন্ত্র ও উন্নত মানসিকতা গড়ে ওঠেনি। তাই ভেরিফিকেশনের পদ্ধতি সংস্কার করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
আশা করি, যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে গণ-প্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখবে। পুরোনো বৈষম্য থাকুক এবং নতুন বৈষম্যের সৃষ্টি হোক—তা আমরা চাই না। জুলাই অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারীদের রক্ত আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেরণা হয়ে উঠুক।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন