বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতিতে কিভাবে উদযাপিত হয় ঈদুল ফিতর

gbn

রমজান মাস শেষে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের পালিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে একটি ঈদুল ফিতর। এ উৎসবের মাধ্যমেই পবিত্র রমজান মাসের সমাপ্তি ঘটে। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর হয়ে ওঠে পরিবার, বন্ধু ও সম্প্রদায়ের মিলনমেলা। অত্যন্ত উৎসাহ এবং আনন্দের সঙ্গে পালিত হয় এই পবিত্র উৎসব।

বাংলাদেশের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ দিনটি উদযাপিত হয়। সারা বিশ্বে ঈদের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্য প্রায় একই হলেও দেশভেদে রয়েছে নানা রীতি, পোশাক ও খাবার। তবে প্রতিটি সংস্কৃতিতে ঈদের মূল উপাদান আনন্দ ও উদারতা। 

 

সংযুক্ত আরব আমিরাত
বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই ঈদ উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি শুরু হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

এ আয়োজনে নেই কোনো কমতি। ঘর সাজানোর মধ্য দিয়ে বাড়তি আমেজ নিয়ে আসে ঈদ। নানা রঙের বাতি দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয় বাড়ি-ঘর। আর নতুন পোশাক তো আছেই পাশাপাশি তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি।

 

 

ঈদের সকালে মুসলমানরা ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য জড়ো হন। নামাজের পর শুরু হয় উপহার বিনিময়। থাকে নানা পদের খাবার। এ ছাড়া মানুষ আতশবাজি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কার্নিভালের মতো উৎসবে অংশগ্রহণ করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে দান করা ঈদের একটি অপরিহার্য অংশ।

রমজান এবং ঈদের সময় মুসলমানদের দরিদ্রদের দান করতে উৎসাহিত করা হয়। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা খাবার, পোশাক এবং অর্থ বিতরণ করে। যাতে সবাই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারে।

 

সৌদি আরব
নতুন চাঁদ দেখা গেলেই সৌদি আরবে ঈদের আনন্দ শুরু হয়। মুসলমানরা মসজিদে অথবা খোলা জায়গায় ঈদের নামাজ আদায় করে। নামাজ আদায়ের পরে তারপর একে অপরকে ‘ঈদ মোবারক’ বলে শুভেচ্ছা জানায়। দিনটি পালন করা হয় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া এবং সময় কাটানোর মাধ্যমে। ঈদের দিন সৌদির মানুষ তাদের আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেন। শিশু এবং বয়স্কদের নানা উপহারও দেন। ঈদের দিন পুরুষরা ‘কান্দর’ নামের সাদা পোশাক পরিধান করেন। মাথায় দেন ‘গাহফিহ’ নামের টুপি। নারীরা এ দিনে ‘থাউব’ নামের বিশেষ পোশাক পরে থাকেন। 

ঈদের দিন সৌদি মুসলিমরা বাজার থেকে বেশি পরিমাণে চাল কিনে আনেন। তা বাড়ির প্রবেশ দরজার বাইরে রেখে দেন। যাতে অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মানুষ তা নিয়ে প্রয়োজন মেটাতে পারেন। সৌদিরা ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান যেমন বাজপাখি, উটের দৌড় এবং ঐতিহ্যবাহী নৃত্যে অংশগ্রহণ করে। অন্যান্য উৎসবের মধ্যে রয়েছে আতশবাজি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক কার্যক্রম।

তুরস্কে
তুরস্কে ঈদকে ‘শেকার বায়রামি’ বলা হয়, যার অর্থ ‘চিনির ভোজ’। তুরস্কে ঈদ উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মিষ্টি খাবার। তুর্কি লোকেরা তাদের নতুন পোশাক পরে দিন শুরু করে। এরপর তারা বড়দের কাছে দোয়া চাইতে যায়। তুর্কি শিশুরা বড়দের কাছ থেকে মিষ্টি এবং সালামি পায়। তুর্কি লোকেরা ঈদের দিন বাকলাভা এবং হালভার মতো ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রস্তুত করে।

নিউজিল্যান্ড
নিউজিল্যান্ডে মসজিদে বা বাইরের স্থানে সকালের নামাজের মাধ্যমে ঈদ উদযাপন শুরু হয়। তারপরে ইডেন পার্কে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাই অ্যানুয়াল ঈদ ডে’। সেখানে বিভিন্ন আয়োজন দেখতে জড়ো হয় মানুষ। এরপর সমাবেশ এবং ভোজসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পরিবারগুলো উপহার বিনিময় করে এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার ভাগাভাগি করে নেয়। সম্প্রতি অকল্যান্ড, ওয়েলিংটন এবং ক্রাইস্টচার্চের মতো প্রধান শহরগুলোতে ঈদ উৎসবগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই উৎসবগুলোতে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সুস্বাদু খাবারের স্টল এবং শিশুদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকে। সবাই আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে দিনটিতে।

ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়ায় ঈদকে বলা হয় ‘হারি রায়া ঈদুল ফিতর’। ঈদের নামাজ সাধারণত বড় খোলা জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ এ দিনটিতে নারীরা পরেন ‘কেবায়া কুরঙ্গ’ আর পুরুষরা ‘বাজু কোকো’, যা দেশটির ঐতিহ্যবাহী পোশাক। নামাজের পর মানুষ তাদের আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে। ঈদের দিন বিশেষ খাবার হিসেবে তারা কেতুপাত, দোদোল, লেমাংসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার রান্না করে থাকে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। ইন্দোনেশিয়াতেও একই অবস্থা দেখা যায়। 

ইন্দোনেশিয়ায় ‘মুদিক’ করারও ঐতিহ্য রয়েছে, যার অর্থ ছুটির দিনে নিজের শহরে ফিরে যাওয়া। মুদিক ঐতিহ্য এত গুরুত্বপূর্ণ যে সরকার মানুষের ভ্রমণ সহজ করার জন্য বিনা মূল্যে পরিবহনের ব্যবস্থা করে থাকে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমানের দেশটিতে প্রায় ৯ কোটি মানুষ মুদিক যাত্রা করেন। ঈদের দিনে স্থানীয়রা বিগত বছরের কৃতকর্মের জন্য আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের কাছে ক্ষমা চান। 

পাকিস্তান
নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে পাকিস্তানেও ঈদ উৎসব শুরু হয়। ঈদের দিন মানুষ নতুন পোশাক পরে মসজিদে বা বড় মাঠে ঈদের নামাজ পড়ে। নামাজের পর মানুষ তাদের আত্মীয়-স্বজন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে এবং উপহার বিনিময় করে। পাকিস্তানি মুসলমানরা ঈদ উপলক্ষে বিরিয়ানি, খির এবং শিয়ার খুরমার মতো ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রস্তুত করে।

আইসল্যান্ড
যদিও আইসল্যান্ডে মুসলিমরা এখনো সংখ্যালঘু, তবু তাদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। যেহেতু আইসল্যান্ডের গ্রীষ্মের দিনগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ হয়, তাই মুসলমানরা দিনে ২২ ঘন্টা পর্যন্ত রোজা রাখেন। তবে ইসলামী পণ্ডিতরা নিকটতম দেশ থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় বা সৌদি আরবের সময় অঞ্চল পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে রোজা ভাঙার পরামর্শ দিয়েছেন। আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকের মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ের পর মুসলিমরা একত্র হন ইন্দোনেশিয়ান, মিসরীয় ও ইরিত্রিয়ান খাবারের আন্তর্জাতিক ফিউশন ভোজে। ঈদুল ফিতরের আনন্দময় অনুষ্ঠানে শিশুরা তাদের নতুন পোশাক পরে এবং উপহার বিনিময় করে। 

মিসর
মিসরের মানুষ পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া এবং সময় কাটানোর মাধ্যমে ঈদুল ফিতর উদযাপন করে। এদিন মিসরীয়রা বিশেষ খাবার তৈরি করে যেমন ফাত্তা (ভাত, মাংস এবং রুটির মিশ্রণ) এবং কুনাফা (পনির এবং শরবত দিয়ে তৈরি একটি মিষ্টি)। মিসরীয়রা ঈদে তাদের সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক এবং মিষ্টি কিনে দেয়। 

রাশিয়া
রাশিয়ার কয়েকটি প্রদেশে মুসলিমের সংখ্যা বেশি। এসব প্রদেশে ঈদের দিনটি ছুটি থাকে। চেচনিয়া ও দাগেস্তান প্রদেশে ঈদের ছুটি তিন দিন। চেচনিয়ায় ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয়। চাঁদ রাতে গভীর রাত পর্যন্ত তৈরি হয় মিষ্টান্ন এবং অন্যান্য খাবার। সবাই একসঙ্গে ঘুরতে যায় এবং সময় কাটায়। এ দিনে অনেক জায়গায় ‘মানতি’ নামের এক ধরনের খাবার বানানো হয়। আটার রুটির ভেতর ভেড়া বা গরুর মাংসের কিমার পুর দিয়ে ভাপানো হয়। পরে পরিবেশন করা হয় মাখন এবং মেয়নেস দিয়ে। 

চীন
চীনে ঈদ উপলক্ষে সেখানে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় মসজিদে। অন্যান্য প্রদেশেও ঈদের দিনটি সরকারি ছুটি থাকে। এ দিনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় সরকারিভাবে ভেড়ার মাংস সরবরাহ করা হয়। ঈদের দিনে আটা ও ময়দা দিয়ে প্রস্তুত ‘জিয়াং’ নামের এক ধরনের বিশেষ খাবার খুবই জনপ্রিয়। স্যুপ অথবা ভাত দিয়ে এটি খাওয়া হয়। দেশটিতে মুসলিমের সংখ্যা বেশি জিনজিয়ান ও নিংজিয়া প্রদেশে।  

উজবেকিস্তান
মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তানেও ঈদুল ফিতর স্থানীয়দের কাছে ‘রুজা হায়িত’ নামে পরিচিত। দেশটিতে তিন দিনব্যাপী ছুটি নিয়ে ঈদ উদযাপন করা হয়। ঈদের আগের দিনটিকে তারা বলে আরাফা। এই দিনে প্রায় প্রতিটি উজবেক পরিবারে ঐতিহ্যবাহী প্যাস্ট্রি কুশ টিল, বুগিরসক, চাক-চাক ইত্যাদি খাবার তৈরি করা হয়। রাতে ঘরে ঘরে উজবেক প্লভ রান্না হয়। 

তিউনিসিয়া
মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া। সেখানে রমজান মাসজুড়ে অনেক রাত পর্যন্ত বাজার খোলা থাকে। চাঁদরাতে খাবার স্টল, দোকানপাট খোলা থাকে ফজর পর্যন্ত। সব মানুষ রাতভর ঘুরে বেড়ায়। তিউনিসিয়ান মুসলিমদের পছন্দের খাবার হলো খেজুর আর অলিভ অয়েলে তৈরি মিষ্টি খাবার ‘আসসিদা’। ঈদের নামাজের তারা মিষ্টি খাবার খায়। 

যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয় বৈচিত্র্য ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে। মুসলমানরা ঈদের সকালে মসজিদে বা খোলা জায়গায় ঈদের নামাজ আদায় করেন। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো, হিউস্টনের মতো বড় শহরগুলোতে কেন্দ্রীয় মাঠ বা কনভেনশন সেন্টারে ঈদের নামাজের বিশাল জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণে বা কমিউনিটি সেন্টারে সম্মিলিত ভোজ আয়োজিত হয়। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে উদযাপন করে। 

আমেরিকান মুসলমানরাও দরিদ্রদের সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন সেবামূলক প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ উদযাপন হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিশ্রণে। যেমন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা, গান শোনা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার উপভোগ করা। খাবারের মধ্যে রয়েছে বিরিয়ানি, ম্যান্ডি, শরমাসহ আমেরিকান ফিউশন ডিশ। 

ঈদুল ফিতর এমন একটি উৎসব, যা সারা বিশ্বের মুসলমানরা উদযাপন করে। ঈদ উদযাপনে প্রতিটি দেশর নিজস্ব সংস্কৃতি বা অনন্য রীতিনীতি রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করা, নতুন পোশাক কেনা অথবা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা, যা-ই হোক না কেন ঈদ মানে আনন্দ। সারা বিশ্বের মুসলমানরা যখন ঈদ উদযাপনের জন্য একত্রিত হয় তখন শান্তি, ভালোবাসা এবং সম্প্রীতির বার্তা স্পষ্টভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। সবাইকে ঈদ মোবারক!

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন